নকশিকাঁথাঃ সুই সুতোর কারুকাজ by Rafsan Ahmed Rimon

 


একটি ভৌগলিক মানচিত্র অথবা দেশ অনেক কিছুর সমন্বয়ে কালের যাত্রায় প্রবাহমান থাকে। এই যেমন, রাষ্ট্র ব্যাবস্হা,সমাজ,রাজনীতি, অর্থনীতি এবং শিল্প সংস্কৃতি ইত্যাদি। এগুলো প্রত্যেকটা ই একটি দেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ।একটি দেশের এগিয়ে যাওয়াটা এই প্রত্যেকটা সেক্টর এর উপর ই নির্ভর করে। সমাজ ব্যাবস্হা রাজনীতি অর্থনীতির মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ একটির দেশের শিল্প সংস্কৃতি। তো আজকে আমরা বাংলাদেশ এর সংস্কৃতির একটা খুব সুন্দর শিল্প নিয়ে কথাবার্তা বলবো। শিল্প টি হলো নকশিকাঁথা। তো চলুন-


নকশিকাঁথার ধারনা:

নকশি কাঁথা বলতে আসলে সাধারণ কাঁথার উপর বিভিন্ন ধরনের মনোমুগ্ধকর নকশা একে যে কাঁথা তৈরী করা হয় তাকে বুঝানো হয়। এটি ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের লোকশিল্পের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।সাধারণত পূরানো কাপড়ের পাড় থেকে সূতা খুলে অথবা তাঁতিদের থেকে লাল নীল সবুজ সাদা বিভিন্ন রঙের সুতা কিনে সেলাই করে এই নকশিকাঁথা তৈরী করা হয়। এগুলো সাধারণত গ্রামবাংলার মায়েরা বোনেরা অর্থাৎ মহিলারা মনের মাধুরী মিশিয়ে তাদের কল্পনাকে সেলাইয়ের মাধ্যমে  আঁকেন পুরনো এই কাপড়কে, রুপ দেন তাদের মস্তিষ্ক তৈরী হওয়া মনোমুগ্ধকর সব ছবিতে। কল্পনা করে করে আকা এই শিল্পে থাকে ফুল,লতা, পাতা ইত্যাদি৷


নকশিকাঁথা শব্দের উৎপত্তি :

নকশিকাঁথা শব্দটির কাঁথা শব্দটির কোন উৎস স্পষ্টভাবে জানা যায়নি। সঠিকভাবে জানা না গেলেও ধারণা করা হয় কাঁথা শব্দটি পূর্বে উচ্চারিত হত "খেতা" বলে।বাংলায় ধানের ক্ষেতকে অনেক সময় "খেত" বলা হয়। আবার অনেকের মতে, কাঁথা শব্দটি উৎপত্তি হয়েছে সংস্কৃতি শব্দ "কঁথা" হতে। "কঁথা" শব্দটির বাংলা হলো ত্যানা। বা কাপড়ের টুকরা।


নির্মাণশৈলী:

নকশিকাঁথা নির্মিত হয় মূলত বিভিন্ন রঙের সুতা দিয়ে সেলাইয়ের মাধ্যমে। এটি সেলাইয়ের নির্দিষ্ট কোনো নকশা নেই। এই শিল্প এর যিনি শিল্পী এটি সম্পূর্ন ই তার নিজের খেয়ালখুশি মতে নকশা করা হয়। গ্রামাঞ্চলের মহিলাদের ক্রিয়েটিভিটি ফুটিয়ে তোলার এক মহা মাধ্যম হলো এই নকশি কাঁথা। এই নকশি কাথা একজন শিল্পীর রুচিবোধ ফুটিয়ে তুলতে পারে। অবশ্য গ্রামের বেশিরভাগই  মহিলারাই এ কাজে পারদর্শী। এগুলা তারা তাদের নতুন জামাই কে, নাত বৌকে অথবা নিজের মেয়ের নতুন বাচ্চা জন্মগ্রহণ করলে উপহার স্বরুপ দিয়ে থাকে।এটা বেশ পুরোনো ঐতিহ্য। মহিলারা যখন এটি নির্মান কাজ শুরু করেন শুরুতেই নকশা গুলো আঁকেন তারপর তাদের দৈনন্দিন কাজের অবসরের সময়ে একটু একটু করে সেলাই করেন, একমাস দুইমাস কখনো কখনো তিন চার মাসে লেগে যায়।

সেলাইয়ের নির্দিষ্ট কোনো না থাকলেও এই নকশি কাঁথার ক্ষেত্রে অনেক ধরনের জনপ্রিয় সেলাই রয়েছে। যেমন- চলমান সেলাই,লহরী কাঁথা আনারসি কাঁথা, বাকা সেলাই, সুজনী কাঁথা, লেপ কাঁথা, রুমাল কাঁথা, আসন কাঁথা আর্শিলতা ইত্যাদি৷ 

নকশি কাঁথা যে সেলাইয়ের মাধ্যমে তৈরী করা হয় তাকে বলা হয় ফোঁড়। ফোঁড় দেওয়া সুই-সুতার মাধ্যমে। গ্রাম বাংলায় নকশি কাঁথার শিল্পীদের মাঝে অনেক ধরনের ফোঁড় প্রচলিত রয়েছে ।যেমন-রান ফোঁড়, ডবল রান ফোঁড়,ডারনিং ফোঁড়,বেকিঁ ফোঁড়,বখেয়া ফোঁড়,ক্রস ফোঁড়,শেডওয়ার্ক ফোঁড়,বোতামঘড় সেলাই,ডাল ফোঁড়,চেইন ফোঁড়,স্যাটিন ভরাট,ডবল হেরিংবোন ফোড়,লিক ফোঁড় ইত্যাদি। 


নকশা:

নকশি কাঁথার নকশাগুলোতে ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতির গভীর প্রভাব রয়েছে। যদিও কোন নির্দিষ্ট নিয়ম মানা হয় না, তবে ধরে নেওয়া হয় প্রত্যেকটা ভালো সেলাইকৃত নকশি কাঁথার একটি কেন্দ্র থাকবে। বেশিরভাগ কাঁথার কেন্দ্র হলো পদ্ম ফুল এবং পদ্ম ফুলের আশে পাশে নানা রকম আঁকাবাঁকা লতার নকশা থাকে। কখনো শাড়ীর পাড় দিয়ে সীমানা তৈরি করা হয়। নকশাতে ফুল, পাতা, পাখি মাছ, প্রাণী, রান্না আসবাব, এমনকি টয়লেট সামগ্রীও থাকতে পারে। বেশির ভাগ কাঁথার প্রাথমিক কিছু নকশা একই রকম হলেও দুইটি কাঁথা একই রকম হয় না। সাধারণত কাঁথাতে একই নকশা বারবার ব্যবহৃত হয়।

বিভিন্ন ধরনের নকশা যেমন-পদ্ম নকশা, সূর্য নকশা,চন্দ্র নকশা,স্বস্তিকা নকশা,জীবনবৃক্ষ নকশা,পর্বত নকশা,মৎস নকশা,নৌকা নকশা,পায়ের ছাপ নকশা,রথ নকশা,মসজিদ নকশা,পাঞ্জা নকশা,প্রাণী-নকশা,সাজঘর সামগ্রী,রান্নাঘর সামগ্রী, পালকি নকশা ইত্যাদি।


পাঁড়:

পাড় হলো নকশিকাঁথার সীমানা অথবা চারপাশ। নকশিকাঁথা চারপাশে মাধুর্যপূর্ন কারুকাজ হলো কাঁথার পাড়। কাঁথার পাড় বিভিন্ন ধরনের হয়। ধানের শীষ অথবা খেজুর চারি পাড়,বিছে পাড়,বেকি পাড়,বরফি পাড়,চোক পাড়,তাবিজ পাড় ইত্যাদি। 

নকশিকাঁথা দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান তো রাখছেই হাড়িয়ে যাওয়া ঐতিহ্য বা সংস্কৃতি রক্ষা করছে। তবে আগের চেয়ে এর প্রচলন বেশ খানিকটা কমেছে। আমাদের এই সংস্কৃতি রক্ষায় গ্রামের শিল্পীদের আরেকটু যত্নবান হওয়া উচিত। 

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

উপমহাদেশের প্রথম মে দিবস ও প্রতিবাদের সংস্কৃতি